অনলাইন ডেস্ক: চাঁদপুরে মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর জরুরি সাধারণ সভায় সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী তিন মাস কোনো আইনজীবী মাদক মামলায় জামিনের আবেদন করবেন না। একই সভায় আদালতকেন্দ্রিক কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মামলার প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী সমিতির এই সিদ্ধান্তকে শুধু পেশাগত অবস্থান হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। মাদক পরিবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। একজন তরুণ মাদকাসক্ত হলে তার শিক্ষাজীবন ও কর্মক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে এবং পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১,২২,৪২২টি মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলা দায়ের হয়েছিল। এসব মামলায় ১,৩০,৮৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময়ে ১৩,৩৭৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রায় ১১ শতাংশ। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর ৫৬ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
এই তথ্যের আলোকে তদন্তের মান, আলামত সংরক্ষণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ, প্রসিকিউশন, দ্রুত বিচার ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতি ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং এর সদস্যসংখ্যা ৪০০-এর বেশি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে কোনো আসামির জামিন হবে কি না, তা আদালতের আইনগত বিবেচনার বিষয়। আইনজীবীদের জামিনের আবেদন না করার সিদ্ধান্তটি তাদের সম্মিলিত পেশাগত অবস্থান; এতে কোনো মামলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিন নিষিদ্ধ হয় না।
সভায় আদালত-সংশ্লিষ্ট অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত থানায় পৌঁছানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান
চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য লায়ন ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের বিষয়ে আরও কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বিভিন্ন বক্তব্যে মাদক, কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। ১৪ জুন ২০২৬-এর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সমন্বয় সভা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য হিসেবে মাদক নির্মূল ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করা হয়।
২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মাদকবিরোধী র্যালিতেও তিনি অংশ নেন। ১ সেপ্টেম্বর তিনি মাদক, ইভটিজিং ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন এবং আইন নিজের হাতে না তোলার আহ্বান জানান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ
মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার সঙ্গে কিশোর অপরাধী চক্রের যোগসূত্র থাকার কথা বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিশোর গ্যাং দমনে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার নয়, তাদের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, মাদক সরবরাহকারী, অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা এবং সম্ভাব্য আশ্রয়দাতাদেরও তদন্তের আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগ ও বাজারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তাই মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলায় জেলার অপরাধীদের হালনাগাদ তালিকা, দ্রুত তদন্ত ও বিচার, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা সামাজিক প্রভাব যেন বাধা না হয়। আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত, সংসদ সদস্যদের বক্তব্য এবং প্রশাসনের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চাঁদপুর মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।




