অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ও ইউনিট হেড। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মুখ ও চোয়ালের ক্যানসার, দুর্ঘটনায় চোয়াল ভেঙে যাওয়া, জন্মগত ঠোঁট ও তালুকাটা এবং জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারে চিকিৎসা করেছেন। হাজীগঞ্জের সাদ্রা গ্রামের এই কৃতীসন্তানের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে চাঁদপুর শহরে। শুক্রবার তিনি দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের ‘চিকিৎসাঙ্গন’-এর মুখোমুখি হয়ে জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
শৈশব ও চিকিৎসক হওয়ার অনুপ্রেরণা
মোরশেদ আলম জানান, তাঁর গ্রামের বাড়ি হাজীগঞ্জের সাদ্রায় হলেও বাবার সরকারি চাকরির কারণে শৈশবের বড় সময় খুলনায় কেটেছে। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত খুলনায় পড়ার পর চাঁদপুরে এসে বলাখাল যোগেন্দ্রনারায়ণ উচ্চবিদ্যালয় ও চাঁদপুর হাসান স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৮২ সালে কৃষি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন এবং ছয় বিষয়ে লেটার পান। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৯১ সালে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে বিডিএস পাস করেন।
ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল বলে জানান তিনি। মা-বাবা ছিলেন তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণা। নানির চিকিৎসায় জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের সাফল্যও তাঁকে গভীরভাবে উৎসাহিত করে।
পেশাজীবন ও বিশেষায়িত চিকিৎসা
১৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। প্রথম পদায়ন হয় শাহরাস্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যেখানে প্রায় দুই বছর ডেন্টাল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণকালে ক্যানসার এবং দুর্ঘটনায় চোয়াল ভাঙা রোগী দেখে তিনি ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বেছে নেন। পাঁচ বছর পড়াশোনার পর ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ওরাল ক্যানসারের ওপর ফেলোশিপ করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে আক্রান্ত অংশ অপসারণের পাশাপাশি শরীরের অন্য স্থান থেকে হাড় ও মাংস নিয়ে মুখের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন করা হয়। এতে রোগীর জীবন রক্ষার পাশাপাশি চেহারা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা সম্ভব হয়।
ঢাকা ডেন্টাল কলেজে চিকিৎসা ও শিক্ষা
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের ২০০ শয্যার মধ্যে ১৫০টি ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারির জন্য। মুখের ক্যানসার, বড় টিউমার, চোয়াল ভাঙা, ঠোঁট ও তালুকাটা এবং চোয়ালের সংক্রমণসহ জটিল রোগীরা সারা দেশ থেকে সেখানে আসেন। হাসপাতালটিতে আইসিইউ, পোস্ট-অপারেটিভ সাপোর্ট এবং এমএস ও এফসিপিএসের মতো পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্স রয়েছে।
সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
মোরশেদ আলমের মতে, মুখ ও চোয়ালের সমস্যায় মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো অজ্ঞতা ও চিকিৎসায় দেরি করা। দাঁতের ক্ষয় বা সংক্রমণ অবহেলা করলে পুঁজ গাল, চোয়াল ও গলার দিকে ছড়িয়ে শ্বাসনালিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা এড়ানো সম্ভব বলে জানান তিনি।
জন্মগত ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা শিশুদের চিকিৎসা বর্তমানে সহজ হয়েছে বলেও তিনি জানান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে।
তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি পরামর্শ
তাঁর মতে, ভালো চিকিৎসক হতে মৌলিক বই পড়ার পাশাপাশি রোগীর কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখা জরুরি। চিকিৎসকদের জ্ঞান, আন্তরিকতা ও মানবিক গুণাবলি নিয়ে কাজ করতে হবে। রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে তাঁকে মা-বাবা, ভাই-বোনের মতো বিবেচনা করে সেবা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সূত্র: Chandpur Kantha




