অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নয়; লাখ লাখ শিশুর শৈশব, শিক্ষা, আবাসন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে হিফজ, নূরানি ও কিতাব বিভাগে পড়া বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় আবাসিক পরিবেশে থাকে। পরিবার থেকে দূরে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসবাসের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি, নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো থাকা অপরিহার্য।
কওমি মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ, নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস নেই। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বিভিন্ন হিসাবের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ থেকে আরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় আনুমানিক ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকার একটি সরকারি হিসাব জানান। সংখ্যাগত এই অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুনির্যাতনের প্রকৃত চিত্র নির্ণয়ও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নির্যাতনের তথ্য ও সীমাবদ্ধতা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৫ মাসে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৬২ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এতে তিন শিশুর মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়।
JusticeMakers Bangladesh in France-এর ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৪৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি ঘটনা, অর্থাৎ ৫৭.১৪ শতাংশ, মাদ্রাসায় ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ৪৬টি ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষককে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সংগঠনটি জানিয়েছে, এটি সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান নয় এবং কোনো ধর্মীয় বা পেশাগত গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার উদ্দেশ্যে এসব তথ্য তৈরি করা হয়নি।
২০২৬ সালের আরেকটি সংবাদ বিশ্লেষণে চলতি বছরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জড়িত বা ভুক্তভোগী এমন অন্তত ৩৭টি ধর্ষণের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন ছেলে ও ৮ জন মেয়ে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৫টি অভিযোগে শিক্ষক অভিযুক্ত ছিলেন এবং অধিকাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ৭ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে ছিল।
এসব সংখ্যা কওমি মাদ্রাসায় সংঘটিত মোট যৌন নির্যাতনের সংখ্যা নয়। কারণ প্রতিটি মাদ্রাসা, শিক্ষার্থী, আবাসিক ব্যবস্থা, অভিযোগ, তদন্ত ও মামলার তথ্য সংরক্ষণের কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেস নেই। ফলে প্রকাশিত সংখ্যা প্রকৃত ঘটনার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইন আছে, ঘাটতি নজরদারি ও জবাবদিহিতে
কওমি মাদ্রাসা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়—এমন ধারণা থেকে সেখানে আইন প্রযোজ্য নয় বলা সঠিক নয়। সাধারণ ফৌজদারি আইন, শিশু সুরক্ষা আইন এবং যৌন অপরাধসংক্রান্ত আইন এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২০১৩ সালের শিশু আইন শিশু সুরক্ষার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এ ছাড়া ২০০৯ সালে হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য এবং অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের কথাও এতে বলা হয়েছে।
সমস্যাটি মূলত আইন না থাকার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং দ্রুত জবাবদিহির ঘাটতিতে। আবাসিক ব্যবস্থায় বয়সভিত্তিক থাকার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক, দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষক, নিরাপদ স্যানিটেশন, অভিযোগ জানানোর পথ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
শুধু সিসি ক্যামেরা বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না। শোবার ঘর, বাথরুম বা ব্যক্তিগত পরিসরে ক্যামেরা শিশুদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে পারে। প্রয়োজন হলে ক্যামেরা করিডর, প্রবেশপথ, সিঁড়ি, গেট ও অন্যান্য সাধারণ স্থানে সীমিত রাখা এবং ফুটেজ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নীতিমালা নির্ধারণ করা উচিত।
শারীরিক শাস্তিও গুরুতর ঝুঁকি
যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকি। UNICEF ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের MICS তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৮.৮ শতাংশ গত এক মাসে কোনো না কোনো সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল। ৬৪.৬ শতাংশ শারীরিক শাস্তি এবং ৩০.২ শতাংশ গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছিল।
UNICEF-এর একটি আঞ্চলিক গবেষণায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের একটি নমুনায় মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তির অভিজ্ঞতা ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল। এটি সমগ্র কওমি মাদ্রাসার বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান নয়, তবে মাদ্রাসা শিক্ষায় শারীরিক শাস্তি নিয়ে একটি গবেষণাগত সতর্কবার্তা।
সরকার ২০১১ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করে। ওই নির্দেশনায় মাদ্রাসাকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই শিক্ষক শাসন করছেন—এই যুক্তিতে শিশুকে মারধর, বেত্রাঘাত বা অন্যভাবে নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙার প্রয়োজন
শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অপরাধের পাশাপাশি তা গোপন রাখার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিও বড় সমস্যা। অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক হলে তার হাতে কর্তৃত্ব, ধর্মীয় মর্যাদা, শিক্ষাগত নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব থাকে। ছোট শিশুরা অনেক সময় ঘটনাটিকে অপরাধ হিসেবে বুঝতেও পারে না।
পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার মানসিকতার কারণে অভিযোগ চাপা পড়তে পারে। সন্তানকে মাদ্রাসা থেকে বের করে নেওয়া, সামাজিক অপমান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার ভয়েও পরিবার নীরব থাকতে পারে। ফলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বদলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ কওমি শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি বেসরকারি বোর্ড। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেফাকের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২২ সালের ২,২৫,৬৩১ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ৩,৪৯,৭৭৬ হয়েছে। তবে পরীক্ষা নেওয়া বা সনদ দেওয়ার দায়িত্ব এবং আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এক নয়।
প্রয়োজন সমন্বিত শিশু সুরক্ষা কাঠামো
প্রথমে জাতীয় কওমি মাদ্রাসা ডাটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন। কোন মাদ্রাসা কোথায়, শিক্ষার্থী ও আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষক, আবাসিক ভবনের ধারণক্ষমতা, সংশ্লিষ্ট বোর্ড, পরিচালনা কমিটি এবং শিশু সুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য এতে থাকা দরকার।
শিক্ষক ও আবাসিক কর্মীদের পরিচয় যাচাই, শিশু সুরক্ষা প্রশিক্ষণ, বয়সভিত্তিক আবাসিক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক, নিরাপদ অভিযোগ বাক্স, গোপন অভিযোগের ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাধীন অভিযোগের পথ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গুরুতর অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে জানানোর নিয়ম বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। প্রতিটি মাদ্রাসায় একজন Child Protection Focal Person রাখার প্রস্তাবও বিবেচনা করা যেতে পারে।
শিক্ষক বা জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ সালিশে তা মীমাংসার সুযোগ বন্ধ করা উচিত। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী পুলিশ, শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
শিশুদের জন্য Child Helpline 1098 রয়েছে, যেখানে নির্যাতন, সহিংসতা ও শোষণের ঘটনায় শিশু নিজে বা তার হয়ে অন্য কেউ বিনামূল্যে যোগাযোগ করতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সেবাটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার কথা। তবে আবাসিক শিশুরা কীভাবে নম্বরটি জানবে, যোগাযোগের সুযোগ পাবে এবং অভিযোগের পর নিরাপদে সরানো হবে—এসব বিষয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা পরিকল্পনায় থাকা দরকার।
কওমি মাদ্রাসা সংস্কার মানে কওমি শিক্ষার বিরোধিতা নয়। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে অপরাধ ঘটলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি নির্যাতনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। বেফাক ও অন্যান্য কওমি বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, আলেমসমাজ, অভিভাবক, শিশু অধিকার সংগঠন এবং সরকারকে যুক্ত করে একটি জাতীয় safeguarding framework গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একটি শিশুর ধর্মীয় শিক্ষা পাওয়ার অধিকার যেমন আছে, তেমনি নিরাপদে বেঁচে থাকা, নির্যাতনমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকারও সমানভাবে আছে।




