অনলাইন ডেস্ক: সৌদি আরবের পূর্ব উপকূলে কাতিফ শহরের কাছে আরব উপসাগরে থাকা তারুত দ্বীপকে বাইরে থেকে খেজুরবাগান ও ঘনবসতিপূর্ণ সাধারণ জনপদ মনে হলেও এর মাটির নিচে মেসোপটেমিয়া, দিলমুন ও প্রাচীন উপসাগরীয় বাণিজ্যের হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। ‘সাউদিপিডিয়া’-র বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু ঐতিহাসিকের হিসাবে দ্বীপটির ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছরেরও আগের। এ কারণে তারুতকে আরব উপদ্বীপের অন্যতম প্রাচীন জনপদ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কাতিফ গভর্নরেটের উপকূলের কাছে অবস্থিত দ্বীপটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩.৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। এর আয়তন ২০.৩ বর্গকিলোমিটার। রিয়াদ রোড, উহুদ রোড ও আম্মার বিন ইয়াসির স্ট্রিটের মাধ্যমে এটি কাতিফের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি ও মাছ ধরা এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
ভূতাত্ত্বিকভাবে প্লাইস্টোসিন যুগে গঠিত তারুতের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও খেজুরগাছে ঢাকা। কাতিফের তারুত টিলায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দের উবাইদ যুগ থেকে তৃতীয় সহস্রাব্দ পর্যন্ত বসতির প্রমাণ মিলেছে। প্রাচীন নামগুলোর মধ্যে ‘টায়ারস’ ও ‘ইশতারুত’ উল্লেখযোগ্য। নামটির সঙ্গে ইশতার বা আস্তারতে দেবীর সম্পর্ক থাকার ধারণা প্রচলিত হলেও গবেষকেরা বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করেননি।
সাউদিপিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তারুত ছিল দিলমুন সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মেসোপটেমিয়া ও পূর্ব আরবের উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে দ্বীপটির বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে মেসোপটেমিয়ার জেমদেত নাসর সভ্যতার মৃৎপাত্র, দিলমুন মৃৎশিল্প এবং ‘তারুত মূর্তি’ উল্লেখযোগ্য। চুনাপাথরের তৈরি ৯৪ সেন্টিমিটার উঁচু মূর্তিটিতে ভাঁজ করা হাতের এক নগ্ন পুরুষকে দেখা যায়। এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি বলে ধরা হয়। বর্তমানে রিয়াদের জাতীয় জাদুঘরে এর পুনরুদ্ধার করা মূর্তি প্রদর্শিত হচ্ছে।
দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা নির্মাণ, বালু সরানো ও ভবন সংস্কারের সময়ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। ১৯৬০-এর দশকে ডেনিশ প্রত্নতাত্ত্বিক দল এখানে গবেষণা করে।
তারুত দুর্গ ও প্রাচীন বন্দর
খেজুরবাগানের মাঝখানে উঁচু টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তারুত দুর্গ, যা স্থানীয়ভাবে ‘পর্তুগিজ দুর্গ’ নামেও পরিচিত। দুর্গটির নির্মাণকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, এটি উয়ুনি আমিরাতের আমলে নির্মিত; আবার কারও মতে, ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজরা দুর্গটি গড়ে তোলে। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৫৪৪ সালের ২৯ মার্চ পর্তুগিজরা এটি সংস্কার করে। পরে অটোমান আমলেও দুর্গটির সংস্কার হয়।
দুর্গটির চারপাশে চারটি বুরুজ ছিল, যার তিনটি বর্তমানে টিকে আছে। দেয়ালের পুরুত্ব ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার। প্রাঙ্গণের মাঝখানে একটি গভীর কূপ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপদের সময় আগুন ও ধোঁয়ার মাধ্যমে দুর্গ থেকে সংকেত পাঠানো হতো।
দুর্গের পাদদেশের ‘আইন আল-আওদা’ বা ‘আইন তারুত’ ঝরনাটি একসময় দ্বীপের সেচব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো গন্ধকযুক্ত ঝরনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে ঝরনাটি প্রায় শুকিয়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে অনেকে এলাকায় চলমান তেল উত্তোলনকে দায়ী করেছেন।
তারুতের দক্ষিণ কোণে থাকা দারিন একসময় বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। মুক্তা বাণিজ্যের পাশাপাশি কস্তুরী, আতর, মসলা, কাপড় ও তলোয়ারের বেচাকেনাও সেখানে হতো। পুরনো দিয়ারা এলাকায় এখনও প্রাচীন বাড়িঘর, বাজার ও হস্তশিল্পের নিদর্শন রয়েছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তারুত দুর্গের বুরুজে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দুর্গটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত নয়। ২০২২ সালে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান দারিন ও তারুত দ্বীপের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সাউদিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য ২৬৪ কোটি ৪০ লাখ সৌদি রিয়াল বরাদ্দ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার লক্ষ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করা এবং জীবনযাত্রার মান ও পর্যটন অর্থনীতি উন্নত করা। এর আওতায় দারিন দুর্গ ও বিমানবন্দরকে পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর, সাংস্কৃতিক উৎসব, হাঁটার পথ, ম্যানগ্রোভ বন এবং পরিবেশবান্ধব হোটেল-লজ নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা ১৩ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রার কথাও বলা হয়েছে।




