অনলাইন ডেস্ক: কয়েক দিন আগে মাস্টার্সের ক্লাসে গিয়ে লেখক শিক্ষার্থীদের মন খারাপ দেখতে পান। কারণ জানতে চাইলে এক শিক্ষার্থী জানান, প্রতিদিন চার-পাঁচটি ক্লাসের চাপে চাকরির প্রস্তুতির সময় পাওয়া যাচ্ছে না। তার কথায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ পায়। শিক্ষার্থীদের ধারণা, ক্লাসে চার-পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় করে অর্জিত শিক্ষা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর সুযোগ দেশ দিতে পারবে না।
এ অবস্থায় একটি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করে শিক্ষার্থীরা কী লাভ পাচ্ছে—সে প্রশ্ন সামনে আসে। কোনো বিষয় যদি বাস্তব জীবনে কর্মে প্রবেশের সিঁড়ি না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। লেখকের মতে, ঘটনাটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন একটি মৌলিক সমস্যা তুলে ধরে, যেখানে কাঠামো থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে যথেষ্ট সংযোগ নেই।
শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সক্ষমতা ও সমাজের প্রয়োজনকে শিক্ষার কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে না। ফলে পড়াশোনা করলেও বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা, মানসিকতা ও অবকাঠামো গড়ে উঠছে না। এতে একপর্যায়ে শেখার আগ্রহ কমে যায় এবং শিক্ষার্থীরা ভাবতে শুরু করে, তাদের পড়াশোনা বাস্তবে কোথায় কাজে লাগছে।
একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি শিক্ষা। টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ, সৃজনশীল ও জ্ঞানভিত্তিক জনগোষ্ঠী প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষার মান, উদ্দেশ্য ও মানুষের আস্থার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সংকট রয়েছে। ডিগ্রি বাড়লেও দক্ষতা একইভাবে বাড়ছে না—এমন বাস্তবতায় শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এখনো প্রধান ধারা। প্রশ্ন করা, বিতর্ক, বিশ্লেষণ ও নতুন ধারণা তৈরির বদলে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও সৃজনশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। চাকরিদাতাদের অভিযোগ, সনদধারী শিক্ষার্থী বাড়লেও দক্ষ মানবসম্পদের সংকট কমছে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগও শিক্ষার প্রতি আস্থা নষ্ট করছে। বিভিন্ন পাবলিক, ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় এমন অভিযোগ সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে অনিয়ম বেশি কার্যকর—এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে বলে লেখায় বলা হয়েছে। এতে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের হতাশা বাড়ছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতাও বড় সংকট। অনেক শিক্ষার্থী এমন পেশায় প্রবেশ করছে, যার সঙ্গে তাদের পড়াশোনার সম্পর্ক নেই। ফলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের উদ্দেশ্য দুর্বল হচ্ছে।
ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের উদাহরণে চিন্তাশক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয় শিক্ষার মান বাড়াতে পারে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না পাওয়া, নীতির ধারাবাহিকতার ঘাটতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ এবং সীমিত গবেষণা সুবিধাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সনদ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার বাইরে গিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্লেষণধর্মী, গবেষণাভিত্তিক ও দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি।




