অনলাইন ডেস্ক: সমাজে মানবিকতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কতটা গভীর হতে পারে, তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জয়নব ভানুর ঘটনা। ছয় ছেলে ও চার মেয়ের মা হয়েও বার্ধক্যে সন্তানদের কারও ঘরে ঠাঁই না পাওয়া শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্য নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। সংবাদ প্রকাশের পর শাহরাস্তি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁর মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত হয়েছে, যা দেখিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের ছোট উদ্যোগও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সংবাদ প্রকাশের পর শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি যাচাই করেন। পরে পারিবারিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে জয়নব ভানুকে তাঁর সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ভবিষ্যতে তাঁর খোঁজখবর নেওয়া এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরদারিতে রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আশ্রয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি
প্রশাসনের এই তৎপরতা প্রশংসনীয়। জনসেবার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা সরকারি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে সন্তানদের লালন-পালন করা একজন মায়ের জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের ঘরে সামান্য জায়গাও না পাওয়া পারিবারিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। পারিবারিক বা সম্পত্তিগত বিরোধ এবং মতের অমিল থাকলেও কোনো কারণেই একজন বৃদ্ধা মায়ের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। মা-বাবার ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব নৈতিকতার পাশাপাশি প্রচলিত আইনেও নির্ধারিত রয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ায় একজন অসহায় মানুষের সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা যে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হতে পারে, জয়নব ভানুর ঘটনা তার উদাহরণ। প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের জনস্বার্থভিত্তিক যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব।
তবে আপাতত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাই শেষ কথা নয়। সেখানে জয়নব ভানুর নিরাপত্তা, নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা, যত্ন ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই মাস পর পুনরায় খোঁজ নেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন মানুষ ও পরিবারের সদস্যদেরও এ দায়িত্বে এগিয়ে আসতে হবে।
জয়নব ভানুর ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে সব সময় বড় প্রকল্প বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। সময়মতো নেওয়া একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপও কারও জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের এই উদ্যোগ একজন বৃদ্ধার আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবার প্রতি আস্থা জোরদারের সুযোগ তৈরি করেছে।




