অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের জীবন সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে রূপ নেয়। ক্ষমতা, বিত্ত বা ব্যক্তিগত অর্জনের মোহ যাদের স্পর্শ করতে পারে না, মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়ে যারা নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেন। শরীয়তপুর তথা বৃহত্তর চরাঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমনই এক অনবদ্য ও অমর নাম আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন মাঝি—চরাঞ্চলের মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ‘কালো মানিক’ খ্যাত চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়ে তিনি চরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জীবদ্দশায় তিনি তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান এবং পাঁচবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে নিজের থাকার জন্য সামান্য এক টুকরো জমিও রেখে যেতে পারেননি বলে এতে দাবি করা হয়েছে। তাঁর হাতে আসা অর্থ ও জীবনের সময় সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়েছে বলেও লেখাটিতে উল্লেখ রয়েছে।
শৈশব ও কর্মজীবন
সঠিক জন্মসাল বা জন্মতারিখ নথিবদ্ধ না থাকলেও ইতিহাস ও পারিবারিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আনোয়ার হোসেন মাঝি ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের বলাশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নুরুল হক মাঝির সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ শিক্ষা শেষে তিনি ঢাকা-চাঁদপুর চলাচলকারী ‘বেঙ্গল ওয়াটার’ লঞ্চে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। এ সময় চরাঞ্চলের কৃষক, মাঝি-মাল্লা ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাঁদের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতিতে আসতে প্রভাবিত করে বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে।
১৯৭২ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এরপর তিনি জনকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
রাজনীতি ও জনকল্যাণ
লেখাটিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্পেশাল ব্রাঞ্চের হয়ে তাঁকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ডাকাত ও অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে তাঁর কার্যক্রমে অপরাধ দমন সফল হয়েছিল বলেও এতে দাবি করা হয়েছে।
১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান ও সামরিক শাসক জেনারেল এইচ. এম. এরশাদের রাজনৈতিক সমীকরণ ও নানা চাপের মুখে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয় বলে ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় প্রবীণদের বরাত দিয়ে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনীতিতে আসার পর তিনি তাঁর কার্গো জাহাজ, লঞ্চ, চাঁদপুর শহরের বাড়ি ও জমি বিক্রি করে সেই অর্থ দরিদ্র মানুষের কল্যাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করেন বলে লেখাটিতে বলা হয়েছে। গ্রেটার তারাবুনিয়াসহ ভেদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথাও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
মৃত্যুর সময় ভেদরগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও নিজের চিকিৎসার ন্যূনতম খরচ বহনের সামর্থ্য ছিল না বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। জীবনের শেষদিকে শারীরিক অসুস্থতা ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার মধ্যেও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট ছিল বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
লেখাটির শেষাংশে বলা হয়েছে, আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন মাঝির শারীরিক মৃত্যু হলেও চরাঞ্চলের পথ, নদী, তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন।




