অনলাইন ডেস্ক: ডিমেনশিয়া শনাক্তকরণে পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব। একই কথা বারবার বলা, কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে না থাকা, পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়া কিংবা হঠাৎ আচরণে পরিবর্তন—এসব দেখলেই আমরা অনেক সময় বলি, ‘বয়স হয়েছে, তাই এমন হচ্ছে।’ কিন্তু সব ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক বার্ধক্যের লক্ষণ নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ডিমেনশিয়া। আর যত দেরিতে বিষয়টি বোঝা যাবে, রোগী ও পরিবারের জন্য পরিস্থিতি তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস। ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো—যত আগে জানা যাবে, তত বেশি প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। তাই ডিমেনশিয়া শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমেনশিয়ার লক্ষণ ও ধরন
ডিমেনশিয়া শুধু স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার নাম নয়। এটি ধীরে ধীরে স্মরণশক্তি, চিন্তাভাবনা, বিচার-বিবেচনা, ভাষা, আচরণ, অনুভূতি এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। রোগী অনেক সময় নিজের পরিবর্তন বুঝতে পারেন না। পরিবারের সদস্যরাও আচরণকে ইচ্ছাকৃত বা বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন মনে করায় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে।
আলঝেইমার্স রোগ, ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া এবং ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া উল্লেখযোগ্য ধরন। রোগের ধরনভেদে লক্ষণ ও অগ্রগতি ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রাথমিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মনে না থাকা, একই কথা বারবার বলা, সময়-স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি, পরিচিত কাজে ভুল করা, গুছিয়ে কথা বলতে অসুবিধা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড বা প্রিয় কাজে আগ্রহ কমে যেতে পারে। মধ্যবর্তী পর্যায়ে রান্না, কাপড় ধোয়া, গোসল, হিসাব-নিকাশসহ পরিচিত কাজ কঠিন হয়ে ওঠে। জিনিসপত্রের অবস্থান, পরিচিত মানুষের নাম বা চেহারা চিনতেও সমস্যা হতে পারে।
শেষ পর্যায়ে রোগী নিজের প্রয়োজন ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। খাবার চিবানো বা গিলতে সমস্যা, পরিচিতজনকে চিনতে না পারা এবং মলমূত্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। তখন প্রায় সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।
পরিবার ও রাষ্ট্রের করণীয়
পরিবারের সদস্যরাই রোগীর দৈনন্দিন আচরণ ও স্মৃতির পরিবর্তন সবচেয়ে আগে দেখতে পান। অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বকা, অপমান বা উপহাস না করে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত। দ্রুত রোগ নির্ণয় হলে রোগী ও পরিবার ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনার সুযোগ পান।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণে প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবায় মূল্যায়ন ও রেফারেলের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা দরকার। প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার তৈরি, পরিবারকে পরামর্শ এবং কম খরচে পরিচর্যা-সহায়তাও প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবীণ সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সচেতনতা ও প্রশিক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিমেনশিয়ার রোগীকে বোঝা নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। স্মৃতি দুর্বল হলেও তার অনুভূতি, ভালোবাসা ও সম্মানের প্রয়োজন থাকে। ডিমেনশিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও আগে শনাক্ত করা মানে আগে প্রস্তুত হওয়া। তাই স্মৃতিভ্রংশকে বয়সের দোষ বলে এড়িয়ে না গিয়ে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।




