অনলাইন ডেস্ক: গ্রাম বা পল্লী নানা সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর, যেখানে গ্রামীণ নারীদের ভূমিকা প্রধান। মাটির ঘর লেপার সময় মহিষের শিং থেকে তৈরি চিরুনি দিয়ে আল্পনা আঁকা থেকে গরুর গোবরে জ্বালানি তৈরি—বিভিন্ন কাজে তাঁদের শিল্পমননের পরিচয় ফুটে ওঠে। শৈশব-কৈশোরে গ্রামলগ্নতার কারণে এসব সংস্কৃতি লেখকের চোখ ও মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে। চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীতেও নারীদের এমন কিছু বিশেষ সংস্কৃতির প্রচলন ছিল, যার কিছু অন্য পল্লীতেও দেখা যেত।
কিছু নীতিকথা ও জনপ্রিয় বাণী কাপড়ের টুকরোয় পেন্সিলে লিখে সুঁই-সুতোয় ফুটিয়ে তোলা হতো। পরে সেগুলো বাঁধাই করে বসার ঘরের উঁচু স্থানে টাঙানো হতো। এতে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি নারীদের শিল্পচেতনারও প্রকাশ ঘটত। বিবাহিতা তরুণী, অবিবাহিত নারী ও কিশোরীরা এ কাজে যুক্ত থাকতেন।
মটোতে ব্যবহৃত বাণীর মধ্যে ছিল—‘গরমকালে পরম পাখা, বাতাস করো মধুমাখা’, ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কী?’ এবং ‘ডালিম পাকিলে পর নিজে ফেটে যায়’। বিভিন্ন ধরনের ফোঁড়ে এসব বাণী সূচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হতো। বর্তমানে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে এ শিল্পের চর্চা আর দেখা যায় না।
লালচে ঢেঁকিশাক বা ঢেঁইয়ের লতা শুকিয়ে মালপত্র বাঁধার দড়ি বানানো হতো। কিশোরী ও তরুণীরা বনবাদাড় থেকে লতা সংগ্রহ করে ঘরের চালে শুকিয়ে নিতেন। পরে ছেলেদের মাধ্যমে সাপ্তাহিক হাটে সেগুলো বিক্রি করা হতো। এই অর্থে তাঁরা প্রসাধনসামগ্রী ও নিজেদের পছন্দের জিনিস কিনতেন।
কিশোরী ও তরুণীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইশারা ভাষার পাশাপাশি ল-কথা, ট-কথা ও ক-কথার মতো কৌশল ব্যবহার করতেন। ট-কথায় মূল শব্দের মধ্যে ‘ট’ ধ্বনি যোগ করে এবং শব্দের আগে ই-কার বসিয়ে কথা বলা হতো। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বাক্যটি ট-কথায় হতো ‘ইটামি তিটুমাকে ভিটালো বিটাসি’।
ক-কথার কৌশল এখন আর জানা যায় না। প্রণিতা বড়ুয়া শৈশবে পঙ্খী বড়ুয়ার মুখে শোনা ‘ক কড়ি কদম কড়ি নি কড়ি মধ্যম’ লাইনটি মনে রেখেছেন, তবে এর পূর্ণ অর্থ তিনি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীর নারীদের ঘণ্ট রান্নায় নানা সবজির সঙ্গে আধা ভাজা চালের গুঁড়ো এবং খোসাসহ ভাজা শুকনো শিমের বিচি ব্যবহার করা হতো। এতে ঘণ্টে পোড়া স্বাদ তৈরি হতো। রান্নার সময় আধা পোড়া আস্ত লাল লঙ্কাও দেওয়া হতো।
পংক্তি ভোজনের সময় মাঝারি আকারের অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে করে ঘণ্ট এনে কাপ দিয়ে কলাপাতার পাতের এক পাশে পরিবেশন করা হতো। সঙ্গে থাকত লবণ ও কাঁচা মরিচ। পল্লিবাসীদের মতে, ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে এই ঘণ্ট গ্রামীণ উৎসব ও অনুষ্ঠানের উপযোগী খাবার ছিল।




