স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা কিংবা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে অপরাধীদের গুনতে হতে পারে জেল-জরিমানা। অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারবে কমিশন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও রয়েছে।
ভোটার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় কঠোর বিধান
ইসির হালনাগাদ করা স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনবিষয়ক বিধিমালায় নির্বাচনী অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিধিমালার ৮০(ক) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে হুমকি, ভয়ভীতি বা আঘাত করা কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া অপরাধ।
একইভাবে অনুমোদিত সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কাজে বাধা দেওয়া, তাঁদের সরঞ্জাম নষ্ট করা, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া কিংবা ভোট দিতে আসা কাউকে জোর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বা প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করলেও আইনের আওতায় আসতে হবে।
এসব অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভোটার স্লিপসহ অন্যান্য প্রচার উপকরণ ব্যবহারে বিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
অনিয়ম প্রমাণিত হলে বাতিল হবে প্রার্থিতা, স্থগিত হতে পারে ভোট
নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে শুধু শাস্তিই নয়, প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও থাকছে নির্বাচন কমিশনের হাতে। কোনো বিশ্বস্ত সূত্র বা লিখিত প্রতিবেদনে প্রার্থী কিংবা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশন তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা যাবে।
এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা কারসাজির মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে কমিশন। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে পুরো কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।
অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের প্রতিশ্রুতি
নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আচরণবিধি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে চায় কমিশন। ভোটাররা যাতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও চলছে।
পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন ২০২৭ সালে
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, প্রথম ধাপ ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপ ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপ ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় আইন অনুযায়ী ২০২৭ সালের ২৭ মে-র মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আসন্ন এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যখন প্রস্তুতি ও প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে, তখন নির্বাচন কমিশনের এমন কঠোর অবস্থান নির্বাচনী মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।




