অনলাইন ডেস্ক: শিশু অধিকার নিয়ে কাজের সূত্রে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় তাঁদের সন্তান বড় করা নিয়ে নানা সংকটে পড়তে দেখা যায়। সম্প্রতি গাইবান্ধায় ১০-১২ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন জানান, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে মুঠোফোন কিনে দেওয়ার পর তার পড়াশোনায় একেবারেই মনোযোগ নেই। মুঠোফোন না দিলে স্কুলে যাবে না—ছেলের এমন জেদের কারণেই সেটি কিনে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। এ ধরনের ঘটনা অনেক পরিবারেই ঘটছে।
সন্তান চাইলেই সবকিছু দেওয়া উচিত নয়। শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়ে তার মতামত শোনা জরুরি হলেও তার সব চাওয়া মেনে নেওয়া প্রয়োজন নেই। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় কোনো সিদ্ধান্তে ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে বড়দের দায়িত্ব সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং সিদ্ধান্তের কারণ তাকে বোঝানো।
অনেক মা-বাবা এ ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খান। কেউ সন্তানের জন্য কোনটি ভালো, তা বিবেচনা না করে সব আবদারে সম্মতি দেন। আবার কেউ সন্তানের মতামত উপেক্ষা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। দুটিই কার্যকর প্যারেন্টিংয়ের পদ্ধতি নয়।
সন্তান পালনের ওপর প্রায় ৪০ বছরে করা শতাধিক গবেষণার সারাংশে শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—ভালোবাসা ও উষ্ণতায় ঘেরা পরিবেশ এবং শেখার যথাযথ কাঠামো। উষ্ণতার মধ্যে শিশুর প্রতি আস্থা ও সম্মান এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা রয়েছে। শেখার কাঠামোর মধ্যে তথ্য, নির্দেশনা ও শিক্ষা দেওয়া অন্তর্ভুক্ত; এটি শাস্তি বা কঠোর নিয়ন্ত্রণনির্ভর পদ্ধতি থেকে আলাদা।
শিশুর বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে মা-বাবার জানা প্রয়োজন। বয়সের সঙ্গে শিশুর চিন্তা ও অনুভূতি বদলায়। তাই সন্তানের মেজাজ ও আচরণ বোঝার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। যথাযথ যত্ন ও দিকনির্দেশনার অভাবে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্ভাবনার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৈশোরে বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা স্বাধীনভাবে চলতে ও নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তবে এ সময়ে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পূর্ণ না হওয়ায় সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ঝুঁকি তারা সব সময় বুঝতে পারে না। তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হলেও সারাক্ষণ নজরদারি সন্তানকে খোলামেলা আলোচনা থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই সম্মানজনক তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি উষ্ণ, স্থিতিশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আস্থার সম্পর্ক প্রয়োজন। নিয়মিত কথা বলা, সন্তানের জীবনের গল্প আগ্রহ নিয়ে শোনা এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান জন্ম দিলেই কার্যকর প্যারেন্টিংয়ের দক্ষতা তৈরি হয় না; এগুলো শেখার বিষয়।
বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার সঙ্গে প্যারেন্টিং শিক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও গর্ভকালীন সেবা, টিকাদান, পুষ্টি ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের যোগাযোগকে এ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় বয়সভিত্তিক প্যারেন্টিং পরামর্শ যুক্ত করলে পরিবারগুলোর কাছে এসব বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে ২০২৩ সালে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের মা-বাবা ও যত্নকারীদের জন্য সমন্বিত প্যারেন্টিং এডুকেশন প্যাকেজ তৈরি হয়। ২০২৪ সালে সরকার সেটি অনুমোদন করে এবং বহু খাতভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি হয়। এখন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিদ্যমান সরকারি সেবার মাধ্যমে প্যাকেজটির কার্যকর বাস্তবায়ন ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ প্রয়োজন। স্কুল, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেও এ কাজে যুক্ত করা দরকার।
শিশুদের ভবিষ্যতের ভিত তৈরি হয় পরিবারে—প্রতিদিনের আচরণ, কথোপকথন ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। তাই মা-বাবাকে কার্যকর প্যারেন্টিং শেখার সুযোগ দেওয়া বিলাসিতা নয়; শিশুর অধিকার ও পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য এটি রাষ্ট্রের জরুরি বিনিয়োগ।




