অনলাইন ডেস্ক: দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটি বলেছে, পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে ‘বছরভিত্তিক’ সুনির্দিষ্ট মান পরিমাপ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতের বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার, বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল গ্রহণ, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গঠন, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন
কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, শুধু পাসের হার বাড়ানো শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি নয়। তাই বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন ও বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার মডেলের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাবও এসেছে, যাতে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার বদলে না যায়।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামঞ্জস্য রাখতে বছরভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি তিন মাস বা ছয় মাস অন্তর শিখনফল মূল্যায়ন চালুর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।
কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বাজেট, বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষা
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ এবং ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার কথা কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে গড়ে প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
আরও যেসব সুপারিশ
শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিন বিনাবেতনে সেবা দেওয়া প্রবীণ শিক্ষকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে দ্রুত এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ এবং তারা বর্তমানে কী করছে, তা জানতে গবেষণা পরিচালনার ওপরও জোর দেওয়া হয়।
শিক্ষার মান ও নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যদের স্কুল-কলেজ পরিদর্শন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ড ও বিভাগীয় দপ্তরের প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধে পৃথক তালিকা তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা কমিটির উদ্যোগকে সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পাসের হারের পরিবর্তে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন ও বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।




